গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনে বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এই ফলাফলকে শুধুমাত্র নির্বাচনী অঙ্ক বা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বরং এটি সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতির প্রতিফলন—যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠন ও জনতার মাঝখানে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে।
জনবল আছে, কিন্তু জনশক্তি নেই
সিলেট অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর শুভাকাঙ্ক্ষী, কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা কম নয়। সামাজিক, ধর্মীয় ও পেশাগত নানা স্তরে এদের অবস্থান রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বিপুল জনবলকে সংগঠিত জনশক্তিতে রূপান্তর করা কি সম্ভব হয়েছে? বাস্তবতা বলছে, হয়নি। নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে এই কর্মী-সমর্থকদের বড় একটি অংশকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা হয়নি। ফলে তারা নিজ উদ্যোগে মিছিল-মহাসমাবেশে অংশ নিলেও নির্বাচনী কৌশলের মূল স্রোতে স্থান পায়নি। এতে সংগঠনের মাঠপর্যায়ের শক্তি ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু কেন্দ্রীভূত হয়নি।
রোকন-কেন্দ্রিক রাজনীতির সংকীর্ণতা
সিলেটে জামায়াতের একটি বড় সাংগঠনিক সমস্যা হলো অতিমাত্রায় রোকন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। অনেক নেতার কাছে ‘জামায়াত’ মানে কেবল রোকন। একজন কর্মী যতই অভিজ্ঞ, বয়স্ক বা শিক্ষিত হোন না কেন, তাঁকে অনেক সময় একজন রোকনের তুলনায় গুরুত্বহীন হিসেবে দেখা হয়। এই মনোভাব সংগঠনের ভেতরে শ্রেণিভিত্তিক দূরত্ব তৈরি করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেখানে বিস্তৃত অংশগ্রহণই শক্তির মূল উৎস, সেখানে এই সংকীর্ণতা ভোটের রাজনীতিতে বড় দুর্বলতা হিসেবে কাজ করেছে।
মানবিক সম্পর্কহীন সংগঠন কি গণভিত্তি পায়
রাজনীতি কেবল বক্তৃতা ও স্লোগানের বিষয় নয়; এটি সম্পর্কেরও রাজনীতি। সিলেটে জামায়াতের অনেক কর্মী-সমর্থক অভিযোগ করেন, তাঁদের পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বা মৃত্যুবরণ করলে সংগঠনের নেতারা খোঁজখবর নেন না। অথচ রোকনদের ক্ষেত্রে এই মানবিক সংযোগ দৃশ্যমান। এই বৈষম্যমূলক আচরণ কর্মী-সমর্থকদের মনে গভীর ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করেছে, যা নির্বাচনের সময় নীরব অনাগ্রহে রূপ নিয়েছে।
আচরণে দূরত্ব, রাজনীতিতে বিচ্ছিন্নতা
৫ আগস্টের পর নেতৃবৃন্দের আচরণে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা অনেকের চোখে পড়েছে। সালামের জবাব দিতে অনীহা, চোখে চোখ রেখে কথা না বলা, যান্ত্রিকভাবে হাত মেলানো—এসব ছোট আচরণ রাজনীতিতে বড় বার্তা বহন করে। সাধারণ মানুষ এসবকে অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখে, যা একটি আদর্শবাদী সংগঠনের ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
স্থানীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতি
সিলেটের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা কমিটির অনেক নেতাই স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন। কমিটিতে স্থানীয় সমাজে গ্রহণযোগ্য, সক্রিয় ও পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা না থাকায় সংগঠনের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভোটাররা ব্যক্তিকে নয়, কেবল একটি নাম বা প্রতীককে দেখেছে—যা আবেগ তৈরি করতে পারেনি।
জনসভা না রোকন সম্মেলন
নির্বাচনী জনসভা সাধারণ ভোটারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। কিন্তু সিলেটে অনেক জনসভা রোকন সম্মেলনের চেহারা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মঞ্চে এলাকার মুরব্বী, সমাজপতি বা পরিচিত মুখের অনুপস্থিতি, অপরিচিত নেতাদের আধিক্য এবং স্পষ্ট উচ্চারণ বা উপস্থাপনার সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও বক্তৃতা দেওয়ার প্রবণতা সাধারণ মানুষের আগ্রহ নষ্ট করেছে। রাজনীতিতে বক্তৃতা বক্তার আত্মতৃপ্তির জন্য নয়, শ্রোতার বোঝার জন্য—এই বোধের ঘাটতি স্পষ্ট ছিল।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আস্থার সংকট
কিছু নেতার বিরুদ্ধে লবিংয়ের মাধ্যমে পদ গ্রহণ, প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ এবং তোষামুদিতে তুষ্টি পাওয়ার অভিযোগ সংগঠনের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এসব বিষয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হতাশা বাড়িয়েছে এবং ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছে।
শেষ কথা
সিলেটে জামায়াতে ইসলামীর এই সাংগঠনিক সংস্কৃতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের চর্চার ফল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। যদি সংগঠনটি ভবিষ্যতে সিলেট অঞ্চলে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়, তবে আত্মসমালোচনা ছাড়া বিকল্প নেই। কর্মী-সমর্থকদের মর্যাদা, স্থানীয় নেতৃত্বের গুরুত্ব এবং মানবিক সম্পর্ককে সাংগঠনিক সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতেই হবে। নচেৎ পরাজয় কেবল নির্বাচনের ফলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
লেখকঃ
জ্যাকব ইলান
সমাজ চিন্তক ও গবেষক।
